বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে ম্যাচটি ছিল রীতিমতো রোমাঞ্চে ভরপুর। ম্যাচজুড়ে নাটকীয় মুহূর্ত আর টানটান উত্তেজনার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ১১ রানের দারুণ জয়ে সিরিজ নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ। তিন ম্যাচের এই ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে দারুণ সাফল্য পায় মেহেদি হাসান মিরাজের দল।

ম্যাচের শুরুতেই ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠেন বাংলাদেশের ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। ইনিংসের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে পাকিস্তানের বোলারদের চাপে ফেলেন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের ইনিংস গড়ে তুলে শেষ পর্যন্ত অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। তার ব্যাটিং ছিল দৃষ্টিনন্দন ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এই ইনিংসের মাধ্যমেই ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম শতকের দেখা পান তানজিদ। ৯৮ বলে ৬টি চার ও ৭টি ছক্কার সাহায্যে তিনি ১০৭ রানের চমৎকার ইনিংস খেলেন। ৩১তম ওয়ানডে ম্যাচে এসে পাওয়া এই সেঞ্চুরি তার ক্যারিয়ারের জন্যও বড় মাইলফলক হয়ে থাকে।

তানজিদের এই দুর্দান্ত ইনিংসের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ গড়ে তোলে লড়াকু সংগ্রহ। দ্বিতীয় উইকেটে তার সঙ্গে ৫৩ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। শান্ত ৩৪ বলে ২৭ রান করে হারিস রউফের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে বিদায় নেন। এরপর মাঝের দিকে দলের রান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তাওহিদ হৃদয়। তিনি মাত্র ৪৪ বলে ৪৮ রানের কার্যকরী ইনিংস খেলেন। শেষ দিকে আফিফ হোসেন ৮ বলে ৫ রান করে অপরাজিত থাকেন। নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে বাংলাদেশ ৫ উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করে ২৯০ রান, যা পাকিস্তানের জন্য ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য।

২৯১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটা ছিল ভীষণ হতাশাজনক। মাত্র ১৭ রান তুলতেই তারা হারিয়ে ফেলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। টপ অর্ডারের এমন ভেঙে পড়া দেখে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি খুব দ্রুতই বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকে যাবে। কিন্তু পাকিস্তান দলের বৈশিষ্ট্যই হলো তারা যেকোনো পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন সালমান আগা। তিনি দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে ধীরে ধীরে ইনিংস গড়ে তোলেন এবং পাকিস্তানকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন। চতুর্থ উইকেটে আব্দুল সামাদ ও ঘাজি ঘোরির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ৫০ রানের জুটি হয়। পরে ষষ্ঠ উইকেটে অভিষিক্ত সাদ মাসুদের সঙ্গে ৭৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ম্যাচে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেন সালমান।

নিজের অসাধারণ ব্যাটিং দক্ষতা দিয়ে সালমান আগা তুলে নেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি। ৯৮ বলে ৯টি চার ও ৪টি ছক্কার সাহায্যে তিনি করেন ১০৬ রান। তার এই ইনিংস পাকিস্তানকে প্রায় জয়ের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিল। তবে তার আউট হয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানের জন্য ম্যাচ জেতা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবুও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান শাহিন শাহ আফ্রিদি। অষ্টম উইকেটে সালমানকে দারুণ সঙ্গ দেন তিনি। পরে শেষের দিকে নিজেও কিছু বড় শট খেলেন। ৩৭ বলে ৩৮ রান করে দলকে জয়ের আশা দেখান আফ্রিদি।

ম্যাচের শেষ দুই ওভারে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ২৮ রান। মোস্তাফিজুর রহমানের করা ৪৯তম ওভারে ১৪ রান তুলে ম্যাচে আবারও উত্তেজনা ফিরিয়ে আনেন শাহিন আফ্রিদি। ওই ওভারে দুটি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে পাকিস্তানের সমর্থকদের মধ্যে জয়ের আশা জাগিয়ে তোলেন তিনি।

তবে শেষ ওভারে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রিশাদ হোসেনের করা সেই ওভারের প্রথম দুই বলে কোনো রান নিতে পারেননি শাহিন। তৃতীয় বলে দুই রান নিয়ে কিছুটা চাপ কমালেও শেষ তিন বলে তখনও প্রয়োজন ছিল ১২ রান। চতুর্থ বলটি ডট হলে চাপ আরও বেড়ে যায়। পঞ্চম বলে আম্পায়ারের দেওয়া ওয়াইড সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নেন রিশাদ, যা পরে ডট বল হিসেবে গণ্য হয়। সেই মুহূর্তেই পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে পাকিস্তান অলআউট হয়ে করে ২৭৯ রান। ফলে ১১ রানের নাটকীয় জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ, তিনি ৪টি উইকেট শিকার করেন।

এই ম্যাচে অসাধারণ সেঞ্চুরি করার জন্য ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন তানজিদ হাসান তামিম। একই সঙ্গে পুরো সিরিজে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য সিরিজসেরার পুরস্কারও পান তানজিদ তামিম ও নাহিদ রানা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ২৯০/৫ (৫০ ওভার) – তানজিদ ১০৭, হৃদয় ৪৮*, রউফ ৩/৫২
পাকিস্তান: ২৭৯ (৫০ ওভার) – সালমান ১০৬, সাদ ৩৮, তাসকিন ৪/৪৯

ফল: বাংলাদেশ ১১ রানে জয়ী
ম্যাচসেরা: তানজিদ হাসান তামিম
সিরিজ ফল: ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ ২–১ ব্যবধানে জয়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *